প্রযুক্তি খাতের শেয়ার নিয়ে বেড়েছে ঝুঁকিভীতি

সস্তা ও ছোট কোম্পানির দিকে ঝুঁকছেন বিনিয়োগকারীরা

পুঁজিবাজারের কিছু খাত, বিশেষ করে প্রযুক্তি কোম্পানির শেয়ারদরে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা গেছে।

পুঁজিবাজারের কিছু খাত, বিশেষ করে প্রযুক্তি কোম্পানির শেয়ারদরে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা গেছে। এখন সেসব খাতে সতর্কতা ও ঝুঁকিভীতি ছড়িয়ে পড়েছে। পাশাপাশি অন্য কিছু খাতে দেখা যাচ্ছে উত্থান। এ দুয়ের সম্মিলিত প্রভাবে বিনিয়োগকারীদের পোর্টফোলিও প্রভাবিত হচ্ছে। কোন বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ ও সে খাতে কতটা অগ্রসর হওয়া যায়, সে বিষয়ে পুরনো সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করছেন তারা। খবর রয়টার্স।

শিল্পভিত্তিক মার্কিন সূচক ডাও জোন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাভারেজ শুক্রবার রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছলেও একই সপ্তাহে সফটওয়্যার খাতের শেয়ার থেকে বাজারমূল্য উধাও হয়েছে প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার।

টি রো প্রাইসের ক্যাপিটাল মার্কেটস স্ট্র্যাটেজিস্ট টিম মারি বলেন, ‘যেসব কোম্পানির শেয়ার এতদিন বাজারকে ঊর্ধ্বমুখিতায় নিয়ে গিয়েছিল, সেসব কোম্পানির শেয়ার বিক্রি হয়তো আপাতত থেমেছে। কিন্তু তার বদলে একেবারে ভিন্ন ধরনের শেয়ারে আগ্রাসী কেনাকাটার ঢেউ দেখা যাচ্ছে।’

বিনিয়োগকারীরা এআই হাইপারস্কেলার কোম্পানিগুলোর ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে ভাবছেন। এর মধ্যে রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে যুক্ত অ্যামাজন, মাইক্রোসফট ও অ্যালফাবেটের মতো কোম্পানি। এছাড়া এআইর প্রভাবে ব্যাহত বা ধ্বংস হতে পারে এমন ব্যবসা নিয়েও উদ্বিগ্ন তারা। টিম মারি বলেন, ‘হয়তো কিছুটা বাছবিচার ছাড়াই এখন সবাই সস্তা কোম্পানি কিনতে ছুটছেন।’

অনেক বছর ধরে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর শেয়ারই মার্কিন বাজারকে টেনেছে। এখন সে উত্থান আর শুধু প্রযুক্তি খাতে সীমিত না থেকে শিল্প, স্বাস্থ্যসেবা ও ছোট কোম্পানির শেয়ারেও ছড়িয়ে পড়বে বলে জানান প্রশেয়ারসের গ্লোবাল ইনভেস্টমেন্ট স্ট্র্যাটেজিস্ট সিমিওন হাইম্যান। তিনি বলেন, ‘গত শরৎ থেকেই আমরা বাজারের এ বিস্তার দেখতে শুরু করেছি, সাম্প্রতিক কয়েক দিনে তা সবচেয়ে স্পষ্ট হয়েছে।’

মূলত বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে বিনিয়োগকারীরা। আগে দুর্দান্ত গতিতে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় ছিল এমন সব খাতের ঝুঁকি নতুন করে মূল্যায়ন করছেন তারা। এর মধ্যে রয়েছে মূল্যবান ধাতু, প্রযুক্তি কোম্পানির শেয়ার এবং বিটকয়েনের মতো অনিশ্চিত সম্পদ।

বালাস্ট রক প্রাইভেট ওয়েলথের ওয়েলথ অ্যাডভাইজার জিম ক্যারল বলেন, ‘এসব সম্পদের ওপর ধাক্কার প্রতিক্রিয়ায় বিনিয়োগকারীরা পোর্টফোলিও পুনর্বিন্যাস করছেন। বাজারে সবচেয়ে বেশি নির্ভরতা দেখা যাচ্ছে, এমন লেনদেনগুলো থেকে সরে আসার পথ খুঁজছেন তারা।’

বাজারে সূচকগুলোর তীব্র দৈনিক ওঠানামাকে অভূতপূর্ব বলে বর্ণনা করেন জিম ক্যারল। তার মতে, বাজার পুরোপুরি ‘স্থির’ না হওয়া পর্যন্ত বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ আশ্রয় খুঁজতে থাকবেন।

গত শুক্রবার বৃহদায়তনের বিভিন্ন শেয়ারবাজারে নাটকীয় উত্থান দেখা গেলেও একে অতিরিক্ত গুরুত্ব না দেয়াই ভালো বলে মনে করছেন বিনিয়োগকারীরা। তাদের মতে, ঝুঁকি নিয়ে ‌আশঙ্কা এখনো রয়ে গেছে এবং আগে যারা দরপতনে দ্রুত কেনাকাটায় নামতেন, তাদের অনেকেই এবার স্পষ্টতই ধীর ও বেশি সতর্ক।

ম্যাকুয়ারি গ্রুপের গ্লোবাল এফএক্স অ্যান্ড রেটস স্ট্র্যাটেজিস্ট থিয়েরি উইজমানের মতে, সামনের দিনগুলোয় বাজার পরিস্থিতি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে যথেষ্ট সন্দেহ ও প্রশ্ন থাকবে। প্রশ্নের কেন্দ্রবিন্দু হবে এআই হাইপারস্কেলাররা নতুন মূলধনি ব্যয় থেকে কীভাবে মুনাফা তুলবে এবং এআই পুরনো যে ব্যবসাগুলোকে সরিয়ে দেবে, তাতে ক্ষতির মাত্রা কতটা হবে।

ইনফর্মড মোমেন্টাম কোম্পানির প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা ও পোর্টফোলিও ম্যানেজার ট্রাভিস প্রেন্টিস বলেন, ‘বাজার ওঠানামায় প্রভাবিত হয় না, এমন ডিফেন্সিভ শেয়ারগুলো সত্যিই চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। আমার মনে হয়, এটা শুধু স্বল্পমেয়াদি লেনদেন নয়, বরং অনুমানভিত্তিক সম্পদ থেকে সরে আসার প্রতিফলন।’

সিটিগ্রুপের যুক্তরাষ্ট্র বাজার কৌশলবিদ স্কট ক্রোনার্ট বলেন, ‘এর ফল হলো এমন একটি বাজার, যা ক্রমেই দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ছে। একদিকে পুরনো সব জনপ্রিয় শেয়ার, অন্যদিকে নতুন করে নজরে আসা কোম্পানিগুলো।’

তার মতে, সবাই যখন এআই বিতর্কে মনোযোগ দিচ্ছিলেন, বাজার তখন নীরবে অন্যদিকে সরে গেছে। তখন চুপিচুপি অর্থ ঢুকেছে জ্বালানি খাত, কাঁচামাল উৎপাদনকারী কোম্পানি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও শিল্প খাতে।

প্রযুক্তি নিয়ে আশঙ্কার মাঝে গতকাল এশিয়ার শেয়ারবাজারে উল্লম্ফন দেখা যায়। এতে প্রভাব বিস্তার করেছে নিক্কেই সূচকের বড় লাফ। মূলত জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির বড় ধরনের নির্বাচনী জয়ে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা বেড়েছে। পাশাপাশি মার্কিন চিপ শেয়ার সূচকে শেষ মুহূর্তের ঘুরে দাঁড়ানোও বাজারে স্বস্তি এনেছে।

গতকাল শেয়ারবাজারে সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে জাপানের নিক্কেই সূচক, যা ৩ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছে। তবে সরকারি ঋণ বাড়ার আশঙ্কায় দুই বছর মেয়াদি জাপানি বন্ডের ইল্ড বেড়ে ১ দশমিক ৩ শতাংশে পৌঁছে, যা ১৯৯৬ সালের পর সর্বোচ্চ।

জাপানের বাইরে এমএসসিআই এশিয়া-প্যাসিফিক সূচক ২ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রযুক্তিনির্ভর সূচক লাফিয়েছে ৪ দশমিক ১ শতাংশ। চীনের ব্লু-চিপ শেয়ার উঠেছে ১ দশমিক ৬ শতাংশ।

ইউরোপে ইউরোস্টক্স ৫০ ফিউচার বেড়েছে দশমিক ৩ শতাংশ। একই হারে বেড়েছে ডিএএক্স ফিউচার। আর এফটিএসই ফিউচার দশমিক ৪ শতাংশ ঊর্ধ্বমুখী ছিল। অন্যদিকে গতকাল যুক্তরাষ্ট্রে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ ফিউচার ও ন্যাসডাক ফিউচার উভয়ই দশমিক ১ শতাংশ করে বেড়েছে। শুক্রবার এ দুই সূচকই ২ শতাংশ বেশি ঘুরে দাঁড়িয়ে টানা বড় পতনের ধারায় ছেদ টেনেছিল।

আরও